নিজস্ব প্রতিবেদক: ফারহান
প্রকাশঃ 23-নভেম্বর-2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

মাঝারি কম্পনেই সতর্কবার্তা: ভবিষ্যতের বড় ভূমিকম্পের ইঙ্গিত

মাঝারি কম্পনেই সতর্কবার্তা: ভবিষ্যতের বড় ভূমিকম্পের ইঙ্গিত


ভূমিকম্প ঘটে পৃথিবীর ভূ-পৃষ্ঠ বা ম্যান্টলের নিচে অবস্থিত বৃহৎ টেকটোনিক প্লেটগুলোর নড়াচড়ার ফলে। এই প্লেটগুলো একে অপরের পাশ দিয়ে সরে যায়, ধাক্কা খায় বা কোথাও আটকে থাকে। প্লেটগুলোর এই গতিবিধি ফলে তাদের সংযোগস্থলে দীর্ঘ সময় ধরে শক্তি জমা হয়। যখন এই জমা শক্তি হঠাৎ মুক্তি পায়, তখন পৃথিবীর ভূ-পৃষ্ঠে কম্পন সৃষ্টি হয়, যাকে আমরা ভূমিকম্প বলে থাকি।

এছাড়াও আগ্নেয়গিরির সক্রিয়তা, ভূগর্ভস্থ বাষ্প বা গ্যাসের চাপের পরিবর্তন, হিমবাহ পতন, এমনকি মানবসৃষ্ট কার্যক্রম (যেমন বড় বাঁধ নির্মাণ, খনন কাজ) থেকেও ছোট আকারের ভূমিকম্প হতে পারে।

বিজ্ঞান অনুযায়ী, প্লেটের সংযোগস্থল বা ফল্ট লাইনের বরাবর জমে থাকা শক্তি ‘সাইসমিক তরঙ্গ’-এর মাধ্যমে হঠাৎ মুক্ত হয়ে ভূ-পৃষ্ঠে কম্পন সৃষ্টি করে। ভূমিকম্পের মাত্রা (Magnitude) দ্বারা উৎপত্তিস্থলে নির্গত শক্তির পরিমাণ বোঝানো হয়, আর তীব্রতা (Intensity) নির্ভর করে স্থানীয় ভূ-প্রকৃতি, মাটির প্রকৃতি এবং উৎস থেকে দূরত্বের ওপর। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক ভূমিকম্প

: ভূ-তাত্ত্বিক সতর্কবার্তা। 

২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে নরসিংদীর ঘোড়াশাল অঞ্চলকেন্দ্রিক ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প বাংলাদেশের সিসমিক সক্রিয়তার একটি পরিষ্কার প্রমাণ। এই ভূমিকম্প বড় ক্ষতি না করলেও বিশেষজ্ঞরা একে একটি গুরুতর সতর্ক সংকেত বলে মনে করছেন। কারণ বাংলাদেশের ভূগর্ভে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা চাপ যেকোনো মুহূর্তে বড় আকারে মুক্ত হতে পারে।

বাংলাদেশ ইন্ডিয়ান ও ইউরোশিয়ান প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। এর ফলে এ অঞ্চলে মাঝেমধ্যে মাঝারি বা শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হওয়া স্বাভাবিক। দেশের ভেতরে ও আশেপাশে সক্রিয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফল্ট লাইন রয়েছে—ডাউকি ফল্ট (বাংলাদেশের উত্তরসীমায়),মধুপুর ফল্ট,আসাম ফল্ট,বগুড়া ফল্ট জোন,বঙ্গোপসাগরের পূর্বাংশের সাবডাকশন জোন।

বিশেষত ডাউকি ফল্টে বহু বছর ধরে শক্তি জমা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে ৮.০ মাত্রা বা তার বেশি শক্তিশালী ভূমিকম্প সৃষ্টি করতে পারে। বঙ্গোপসাগরের সাবডাকশন জোনে বড় সরণ ঘটলে তা সুনামির ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।

ফোরশক (Foreshock): আজকের কম্পন কি বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস হতে পারে?

ফোরশক হলো এমন ছোট ভূমিকম্প যা একই ফল্ট লাইনে ভবিষ্যতে ঘটতে থাকা বড় (Mainshock) ভূমিকম্পের আগে ঘটে। তবে কোনো কম্পন যে ফোরশক—এটি প্রধান ভূমিকম্প না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত বলা যায় না।

বাংলাদেশে গত ১০০–১৫০ বছরে ৭ বা তার বেশি মাত্রার বড় কোনো ভূমিকম্প ঘটেনি। এটি একটি সিসমিক গ্যাপ, যা ইঙ্গিত করে—ভূ-গর্ভে চাপ দীর্ঘদিন ধরে জমছে। যে কোনো সময় চাপের আকস্মিক মুক্তি ঘটতে পারে। সাম্প্রতিক ৫.৭ মাত্রার কম্পনটি বিশেষজ্ঞদের মতে সেই জমা শক্তির নড়াচড়ার এক সূচনা হতে পারে। ঐতিহাসিক বড় ভূমিকম্পগুলো আমাদের কী সতর্ক করে? বাংলাদেশ ও আশপাশের অঞ্চলে এ পর্যন্ত কয়েকটি শক্তিশালী ভূমিকম্প ঘটেছে—১৮৬৯ সালের কাছাড় কম্পন – ৭.৬ মাত্রা,১৮৮৫ সালের বেঙ্গল কম্পন – ৭.১ মাত্রা,১৮৯৭ সালের গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকোয়েক – ৮.১ মাত্রা,১৯১৮ সালের শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্প – ৭.৬ মাত্রা বুয়েটের ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারীর মতে—

প্রতি ১০০–১২৫ বছরে ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের সম্ভাবনা, প্রতি ২৫০–৩০০ বছরে ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের সম্ভাবনা রয়েছে।

১৯৩০ সালের পর বড় মাত্রার ভূমিকম্প না হওয়ায় এ ঝুঁকি এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট: ত্রিমুখী বিপদসীমা

বাংলাদেশের প্রধান তিনটি শহর সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে—

১. নরম পলি ও কাদা মাটি (লিকুইফ্যাকশন ঝুঁকি)

২. অপরিকল্পিত নগরায়ণ

৩. দুর্বল নির্মাণ কাঠামো

লিকুইফ্যাকশনের ফলে মাটি তরল হয়ে ভবনগুলো হেলে পড়তে বা ধসে যেতে পারে। বড় ভূমিকম্প হলে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট অভূতপূর্ব মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।

ভূমিকম্প পূর্বাভাস: বিজ্ঞান কতটা সক্ষম?

বর্তমান প্রযুক্তিতে বিজ্ঞানীরা নির্দিষ্ট তারিখ বা সময়ের ভূমিকম্প পূর্বাভাস দিতে সক্ষম নন। তারা কেবল—

অঞ্চলভিত্তিক ঝুঁকি

সম্ভাব্য ক্ষতির মাত্রা

ফল্ট লাইনের সক্রিয়তা

বিবেচনা করে Risk Assessment করতে পারেন।

কিছু দেশ (জাপান, যুক্তরাষ্ট্র) কয়েক সেকেন্ড বা মিনিট আগে সতর্ক সংকেত দিতে পারলেও এটি চূড়ান্ত সমাধান নয়।

প্রতিরোধ ও প্রস্তুতি: ভূমিকম্প মোকাবিলার একমাত্র উপায় ভূমিকম্প অনিবার্য, কিন্তু ক্ষতি কমানোর উপায় সম্পূর্ণ মানবনির্ভর।

 প্রধান কৌশল দুটি—

১. কাঠামোগত প্রস্তুতি (Structural Preparedness)

কঠোরভাবে বিল্ডিং কোড অনুসরণ

ভূমিকম্প সহনশীল নকশা

পুরোনো, দুর্বল ভবন শনাক্ত করে রেট্রোফিটিং

মাটির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ভিত্তি নির্মাণ

ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় উচ্চ ভবন নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ

২. সামাজিক প্রস্তুতি (Social Preparedness)

জনগণের প্রশিক্ষণ (‘Drop, Cover and Hold On’)

নিয়মিত সিমুলেশন মহড়া

দ্রুত উদ্ধার, চিকিৎসা ও জরুরি প্রতিক্রিয়া দল গঠন

স্কুল, অফিস ও ঘরে জরুরি পরিকল্পনা তৈরি

সমন্বিত প্রস্তুতিই মানবিক ও আর্থিক ক্ষতি নাটকীয়ভাবে কমাতে পারে।

সাম্প্রতিক ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এটি বাংলাদেশের নিচে সঞ্চিত শক্তির একটি পরিষ্কার সতর্কবার্তা। যখন বাংলাদেশ একদিকে সক্রিয় ফল্ট লাইনের ওপর, অন্যদিকে দুর্বল নির্মাণ, ঘন জনসংখ্যা ও নরম মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তখন মাঝারি মাত্রার কম্পনও আমাদের ভবিষ্যত বড় বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দেয়।

এখনই সময়—

দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি,

নীতিমালা প্রয়োগ,

কাঠামোগত সংস্কার,

এবং নাগরিক সচেতনতার ওপর জোর দেওয়ার।

কারণ সঞ্চিত শক্তির আকস্মিক মুক্তি যে কোনো দিন আমাদের শত বছরের উন্নয়নকে মুহূর্তে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে পারে।


মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

পাকিস্তানের আকাশে বিরল ‘লেনটিকুলার মেঘ’, বিস্ময়ে হতবাক সবাই

1

টঙ্গীতে দগ্ধ ফায়ার ফাইটার শামীম মারা গেছেন

2

৬ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় সুপারমুন দেখা যাবে আজ

3

যমুনার ভাঙনে নদীগর্ভে শতাধিক ঘর, বিলীন হতে পারে মন্নিয়ার চর

4

লক্ষ্মীপুরে স্কুলে যাওয়ার পথে ট্রাকচাপায় প্রাণ গেল ১০ বছর বয়

5

তা'মীরুল মিল্লাত টঙ্গীতে আন্দোলনের জের: শিক্ষকদের বিরুদ্ধে শ

6

গাজীপুরে যৌথ বাহিনীর অভিযানে অস্ত্র-মাদকসহ আটক ২

7

ঠাকুরগাঁওয়ে ভূমিকম্প অনুভূত

8

কমে গেছে ঢেঁকির কদর

9

হায়দারগঞ্জে বিশাল মিছিলের নেতৃত্বে বীর মুক্তিযোদ্ধা মাস্টার

10

ঢাকা লকডাউন কর্মসূচির দিন গণপরিবহন চলবে: মালিক সমিতি

11

ছাত্রদল নেতা জুবায়েদ হত্যার ঘটনায় তার ছাত্রী আটক

12

প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিলো মোন্থা, বাতাসের সর্বোচ্চ গতি ১১০ ক

13

বিজয় দিবসে পতাকা হাতে প্যারাট্রুপিংয়ে বাংলাদেশের বিশ্ব রেকর্

14

ঈগল-১০ লঞ্চে কিছুক্ষণ আগে ভয়া'বহ অগ্নি*কা*ণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

15

পুলিশের সামনেই ডিম নিক্ষেপের শিকার নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

16

অনিয়মের শীর্ষে নাটোরের আমেনা হাসপাতালে ভোগান্তির শেষ নেই রোগ

17

পাবনার ভাঙ্গুড়ায় ইউনিয়ন বিএনপি সভাপতির বিরুদ্ধে ধর্ষণের ম

18

অর্থ পাচারে লিপ্তদের কোন ছাড় নেই: সরকারের কড়া হুশিয়ারি

19

না ফেরার দেশে চলে গেলেন ওসমান হাদি

20